ইন্টারনেট আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। আমরা এটিকে কাজ, যোগাযোগ, বিনোদন এবং আরও অনেক কিছুর জন্য ব্যবহার করি। তবে ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে অনলাইনে নানা ধরণের হুমকির আশঙ্কাও বেড়েছে। সাইবার অপরাধীরা ক্রমাগত আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করার জন্য আমাদের ডিভাইসগুলোকে ম্যালওয়্যার বা অনলাইন থ্রেটস্ দ্বারা সংক্রামিত করার এবং আরো অন্যান্য ধরণের ক্ষতি করার নতুন উপায় তৈরি করছে৷ প্রতিনিয়ত বাড়ছে নানা ধরণের সংক্রমিত পন্থা। সাথে সাথে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত উক্ত পন্থার বিপরীতে উক্ত সংক্রমন থেকে বেঁচে থাকার উপায় বের করে অ্যান্টিভাইরাসের মাধ্যমে আমাদের নিরাপত্তা প্রদান করছে। বাৎসরিক সাবস্ক্রিপশন গ্রহনের মাধ্যমে আপনার ডিভাইসে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ইনস্টল করা অপরিহার্য। আজ আমরা কীভাবে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার আপনাকে অনলাইন হুমকি থেকে বাঁচাতে পারে তা সম্পর্কে জানব। তো চলুন জেনে নেই অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার কেন ব্যবহার করা জরুরী!
Read Time Scanning
অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার আপনার কম্পিউটারকে সুরক্ষিত রাখতে পারে তার মধ্যে প্রধান একটি উপায় হলোসঠিক সময়ে আপনার সিস্টেমকে সিডিউলভিত্তিক স্ক্যান করা। Read Time Scanning করার অর্থই হল অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যারটি সব সময় আপনার অপারেটিং সিস্টেমের পাশাপাশি লুকিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকটা আমাদের অফিসের সামনে সিকিউরিটি যেভাবে বসে থাকে তার মতো করে। আমরা অফিসের ভেতর বসে বাহিরের কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু সিকিউরিটি আমাদের অজান্তেই নানা ধরণের সমস্যা নিজেই সমাধান করে ফেলছে। কিন্তু ব্যক্তিক্রমধর্মী সমস্যা হলে সেটি সরাসরি আমাদের প্রতিষ্ঠান প্রধানকে জানিয়ে দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠান প্রধান সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করে থাকে। ঠিক তেমনি অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার Read Time Scanning এর মাধ্যমে আমাদের কম্পিউটারের ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করে থাকে। প্রতিনিয়ত আপনার ইন্টারনেট ব্রাউজার এবং কম্পিউটারের বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনের উপর নজর রাখছে। কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ বা ম্যালওয়্যার শনাক্ত হলে সংক্রামিত ফাইলটিকে আলাদা করে আপনাকে অবিলম্বে সতর্ক করবে।

প্রায়ই দেখতে পাবেন, আপনি ইন্টারনেট থেকে কোন ফ্রি সফটওয়্যার বা অনেক টরেন্ট সাইট আছে যেগুলোকে প্রবেশ করার পর যখনই আপনার কম্পিউটারে ম্যালওয়্যার প্রবেশ করার চেষ্টা করবে তখনই ম্যালওয়্যার সনাক্ত করবে। বেশির ভাগ ম্যালওয়্যারগুলো দুর্ঘটনাক্রমে ইন্টারনেট থেকে বা ইন্টারনেট ইমেল সংযুক্তির মাধ্যমে ডাউনলোড করছেন। স্বাভাবিক ঘটনার আদলে ম্যালওয়্যারটি ফাইলের মাধ্যমে বা অ্যাপ্লিকেশনে লুকিয়ে থাকে। তাই অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ছাড়া জানতেই পারবেন না যে আপনার ডিভাইসটি সংক্রামিত হয়েছে৷ যেমন বর্তমান সময়ে রানসামওয়্যার কম্পিউটার ভাইরাসটি কিছু দিন পর পরই বিশ্বের বিভিন্ন কম্পিউটারে আঘাত হানছে। কোনভাবে সংক্রমিত হয়ে গেলে আপনার কম্পিউটারের সবগুলোই ডেটা ইনক্রিপটেড করে ফেলে। মোটা অংক পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে আপনাকে সেই ডেটাগুলো রিকভার করতে হবে। যা কি না সবার সাধ্যের মধ্যে থাকে না।
আরো পড়তে পারেন
Firewall Protection
অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার আপনাকে যে কয়েকটি উপায়ে ইন্টারনেট ক্ষতি হতে রক্ষা করতে পারে তার মধ্যে একটি Firewall Protection। কম্পিউটারে যখনই আমরা ব্রাউজ করি ওই সময়ে আপনার নানা ধরণের ইনকামিং এবং আউটগোয়িং নেটওয়ার্ক ট্র্যাফিক পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করে দায়িত্ব বর্তায় Firewall এর উপর। অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার প্রায়ই একটি অন্তর্নির্মিত Firewall সাথে আসে যা আপনার কম্পিউটারে আশঙ্কাজনক অ্যাক্সেস প্রতিরোধ করতে পারে। Firewall সম্পর্কে আরো কিছুটা বিস্তারিতভাবে যদি বলি।
Firewall হলো আপনার কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের মধ্যে তৃতীয় পক্ষ হয়ে কাজ করে। এটি উভয়ের ভেতর বাঁধা তৈরির কাজ করে। যদি কোন হ্যাকার বা থ্রেট ইন্টারনেট থেকে আপনার ডিভাইস অ্যাক্সেস করার চেষ্টা করে, Firewall তাৎক্ষনিক সংযোগটি ব্লক করে দেয় এবং আপনাকে জানান দিবে। এটি হ্যাকার হতে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করা বা আপনার ডিভাইসে ম্যালওয়্যার ইনস্টল করার চেষ্টাকে আটকাতে সাহায্য করে।
eMail Protection
ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে কম্পিউটারের সব চাইতে বেশি ক্ষতি হয়ে থাকে। আর এ ম্যালওয়্যার সব চাইতে বেশি ছড়ায় ইমেইলের মাধ্যমে। সাইবার অপরাধীরা প্রায়ই ম্যালওয়্যার সম্বলিত সংযুক্তিসহ ইমেল পাঠায় যা খোলা হলে, ম্যালওয়্যার আপনার ডিভাইসকে সংক্রমিত করার চেষ্টা করে। একটি ভালো মানের অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার আপনার ইমেল এবং সংযুক্তিগুলোকে ডাউনলোড করার পূর্বে স্ক্যান করে ডাউনলোড করে। ডিভাইসগুলোকে সংক্রামিত করার আগে কোনও ক্ষতিকারক কোড বা লিঙ্ক আছে কি না তা সনাক্ত করবে এবং এর বিপরীতে তা ব্লক করে দিবে।

eMail Protection অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সাইবার অপরাধীরা তাদের ইমেল খোলার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রতারণা করার নতুনসব উপায় ক্রমাগতভাবে তৈরি করছে। কিছু eMail অথেনটিক উৎস থেকে এসেছে বলে মনে হলেও এতে ক্ষতিকারক কোড বা লিঙ্ক থাকতে পারে। অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ইন্সটল করা থাকলে, আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে আপনার ইমেলগুলি খোলার জন্য নিরাপদ। যখনই ক্ষতিকর কোন প্রভাব কাজ করবে তখনই অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার সেই মেইল বা ডাউনলোডগুলোকে সরাসরি মুছে বা ব্লক করে দিবে।
অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত হ্যাকারদের কার্যক্রমের উপর চোখ রাখে। প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত থ্রেট বা কোডগুলোকে পরীক্ষা করে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যারকে আপডেট করে জানান দেয় বর্তমান সময়ের ব্যবহৃত থ্রেড বা কোডগুলো কি। কি উপায়ে হ্যাক হতে পারে এবং হ্যাকিং এর বিপরীতে কিভাবে অ্যান্টিভাইরাস তার ব্যবহারকারীদের রক্ষা করবে।
Web Protection
ইন্টারনেট দুনিয়ায় প্রচুর ওয়েবসাইট রয়েছে। আমরা হয়তো ১০টা ওয়েবসাইট ব্রাউজ করি প্রতি মাসে। কিন্তু ১০ বছর আগেও জেনেছি পৃথিবীতে প্রায় ১ কোটির উপর ওয়েবসাইট আছে। যার মধ্যে প্রচুর ওয়েবসাইট পাবেন যেগুলো ম্যালওয়্যার রয়েছে। ক্ষতিকর সফটওয়্যার থেকে রক্ষা পেতে অবশ্যই আপনাকে এর বিপরীতে সিকিউরিটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে থ্রেটগুলোকে মোকাবেলা করতে হবে। ব্রাউজ করার সময় যখনই আপনার কম্পিউটার ক্ষতিকারক কোন ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা তৈরি হয় তখন অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার আপনাকে রক্ষা করবে। সাইবার অপরাধীরা প্রায়ই জাল ওয়েবসাইট তৈরি করে ইন্টারনেট ব্যবহারীদের তথ্য হাতিয়ে নেয়। অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার জাল ওয়েবসাইটগুলোকে সনাক্ত করে এবং ব্লক করে দেয়। আপনার ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে বাঁধা তৈরি করে। আপনি যখন অনলাইনে কেনাকাটা করছেন বা আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অ্যাক্সেস করছেন তখন এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই ওয়েবসাইটগুলোতে আপনার আর্থিক তথ্য লিখতে হয়। অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার আপনার আর্থিক তথ্যের বেহাতের বিষয়েও সব সময় সজাগ।
Auto Update
অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত হ্যাকারদের কার্যক্রমের উপর চোখ রাখে। প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত থ্রেট বা কোডগুলোকে পরীক্ষা করে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যারকে আপডেট করে জানান দেয় বর্তমান সময়ের ব্যবহৃত থ্রেড বা কোডগুলো কি। কি উপায়ে হ্যাক হতে পারে এবং হ্যাকিং এর বিপরীতে কিভাবে অ্যান্টিভাইরাস তার ব্যবহারকারীদের রক্ষা করবে। আমাদের দেশের অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যারকে আপডেট করার বিষয়ে কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের মধ্যে এক ধরণের অলসতা পরিলক্ষিত হয়। তারা এই আপডেটকে বিরক্তিকর এবং ইন্টারনেট ব্যয় মনে করে। কিন্তু আপডেট যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা সেই ব্যাপারে জানতে আগ্রহি নয়। তবে কম্পিউটারকে সুরক্ষিত রাখতে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার আপডেটের বিকল্প নেই। সাইবার অপরাধীরা সর্বদা নতুন ধরনের ম্যালওয়্যার তৈরি করে, তাই এই নতুন হুমকির বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য আপনার অবশ্যই অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার আপ টু ডেট রাখা গুরুত্বপূর্ণ৷ মজার তথ্য হচ্ছে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিক থাকলেই নিজেই এসব কাজ-কর্ম সম্পাদন করে থাকে।

পরিশেষে, আপনার কম্পিউটারকে অনলাইন হুমকি থেকে রক্ষা করার জন্য অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যারের বিকল্প হতেই পারে না। কারণ কম্পিউটার নিয়ন্ত্রন হয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে। এই সফটওয়্যার যেমন ক্ষতিকরভাবে ব্যবহার করে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ক্ষতি করে ঠিক এর বিপরীতে সফটওয়্যারের মাধ্যমেই সেই ক্ষতির বিরুদ্ধে রুখেও দাঁড়াতে পারে। তাই কম্পিউটারে তৈরি ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস থেকে কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের রক্ষা করতে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ম্যালওয়্যার সনাক্তকরণ ও অপসারণে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ফায়ারওয়ালের মাধ্যমে সুরক্ষা প্রদান করে। ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ছে, সাথে সাথে অনলাইন হুমকির বাড়ছে। আপনি সাইবার অপরাধীদের থেকে সুরক্ষিত আছেন কি না তা নিশ্চিত করতে আপনার ডিভাইসে (সেটি স্মার্টফোন হোক কম্পিউটার হোক) অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার অবশ্যই ইন্সটল থাকা জরুরী।
