শুরুতেই ছোট করে সৌর বিদ্যুৎ সম্পর্কে ধারণা দেই। সৌরবিদ্যুৎ হচ্ছে সূর্য্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। যা কি না আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত যে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে থাকি, ওই রকম ফ্যান লাইট এ সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে চালানো যায়। আমরা দুইভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি। ১. AC (Alternative Current) – সরকারি যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি AC সেটিই। সাধারণত এটি ২২০ ভোল্ট হয়ে থাকে। ২. DC (Direct Current) – এটি হচ্ছে ১২/২৪ ভোল্ট। মোবাইল ফোন চার্জার থেকে যে ভোল্ট বিদ্যুৎ পাই, ডেকোরেশনাল লাইট বা চার্জ লাইট ব্যবহার করি সেটি DC। সৌরবিদ্যুৎ ১২/২৪ ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকে। তবে বাসায় ব্যবহৃত ফ্যান লাইট ব্যবহারের জন্য আলাদা করে ইনভার্টার সংযুক্ত করলেই বর্তমানে আপনার বাসায় ব্যবহৃত ফ্যান লাইটগুলো সৌর বিদ্যুৎ দিয়ে চালাতে পারবেন।
কয়েকটি প্রশ্নোত্তর। উত্তরগুলোতে সোলার সম্পর্কে বিস্তারিত জানবেন

এখন কয়েকটি জিজ্ঞাসা প্রশ্নাকারে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করি।
প্রশ্ন : সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে সরাসরি আমাদের বাসায় সেটআপ করা ফ্যান, লাইট বা অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রগুলো কি চালাতে পারবো?
উত্তর : সৌরবিদ্যুতের প্যানেল লাগালাম আর আমাদের বাসায় ব্যবহৃত ফ্যান, লাইট বা অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রগুলো চালানো শুরু করলাম। না এভাবে আপনার বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলো চালাতে পারবেন না। যদি চালাতে চান তাহলে মানসম্মত Inverter লাগবে। বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে অনেক ধরণের IPS মেশিন আছে। যেগুলোতে সোলার ইনর্ভাটার ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে আপনি ওই IPS এর সাথে সোলার বিদ্যুতের সংযোগ দিতে পারবেন। এছাড়া IPS ছাড়াও কোয়ালিটিসম্পন্ন ইনভার্টার রয়েছে যেগুলো দিয়ে বাসায় ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো চালানো যাবে।
প্রশ্ন : সোলার বিদ্যুতের মাধ্যমে কি কি করা যাবে?
উত্তর : সোলার বিদ্যুতের মাধ্যমে লাইট, ফ্যান, ছোট-খোট নন-প্রফেশনাল মটর ব্যবহার করা যাবে। তবে ওই ফ্যান, লাইট ও মটরগুলো DC (১২/২৪) ভোল্টের হতে হবে। বাজারে প্রচুর DC ফ্যান, লাইট, মটর রয়েছে। এবং ভালো ভালো কোম্পানীগুলো এখন DC ইলেক্ট্রনিক পণ্য বাজারজাত করছে।
প্রশ্ন : সৌর বিদ্যুতের জন্য মাসিক কোন চার্জ বহন করতে হয়?
উত্তর : না। প্রাথমিক অবস্থায় যে খরচ হয় সেটাই। ৪/৫ বছর পরে ব্যাটারি পরিবর্তন বা সংযোজন করা লাগতে পারে। এর ভেতর তেমন কোন খরচ নেই।
প্রশ্ন : সৌর বিদ্যুৎকে সরকারি বিদ্যুৎ (গ্রিড) এর সাথে যুক্ত করা যায় কি?
উত্তর : হ্যাঁ যায়। উন্নত মানের অনেক ইনভার্টার রয়েছে যা কি না সৌর বিদ্যুৎ এবং সরকারি বিদ্যুতের সমন্বয়ে কাজ করে।
প্রশ্ন : সৌর বিদ্যুৎ কি পরবর্তী ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করে রাথা যায়?
উত্তর : জ্বি! যত বেশি অ্যাম্পেয়ারের ব্যাটারি হবে তত বেশি সময় পাওয়ার ব্যাকআপ পাবেন।
প্রশ্ন : বর্ষাকালে বা কুয়াশাচ্ছন্ন হলে কি সোলার কাজ করে?
উত্তর : কাজ করে তবে ভালো সূর্য্যের আলোতে যে রকম পাওয়ার সাপ্লাই করে বর্ষাকালে বা কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থায় পাওয়ার সাপ্লাই অনেক কমে যায়। ভালো মানের সোলার প্যানেলগুলো অল্প আলোতেও পাওয়ার সাপ্লাই করে।
প্রশ্ন : সোলার প্যানেল কয় ধরণের?
উত্তর : সোলার প্যানেল দুই ধরণের। ১. Poly Panel ২. Mono Panel । মনো সোলার প্যানেল থেকে আউটপুট ভালো পাওয়া যায়। বর্ষাকালে বা কুয়াশাচ্ছন্ন হলেও মনো সোলার পাওয়ার সাপ্লাই করে থাকে।
প্রশ্ন : সোলার প্যানেলসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতির স্থায়িত্ব কেমন?
উত্তর : সোলার প্যানেলগুলো যদি না ভাঙ্গে বা পুড়ে যায় কিছুটা যত্ন করলে প্রায় ২০ বছর বা বেশি ব্যবহার করা যায়। সোলার কন্ট্রোল যদি মানসম্মত হলেও অনেকদিন ব্যবহার করা যায়। মানসম্মত ব্যাটারিগুলো ৫-৮ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।
প্রশ্ন : শুনলাম সোলার প্যানেলের লাইট, ফ্যান ও মটর আলাদা! সত্যি কি তাই?
উত্তর : জ্বী। ইনভার্টার ছাড়া সোলার প্যানেল দিয়ে DC ১২/২৪ ভোল্ট যন্ত্রপাতি চালানো যায়। তাই DC ফ্যান, লাইন এবং মটরসহ ইত্যাদি আলাদাভাবে ক্রয় করতে হবে।

আনুমানিক খরচ
সৌর বিদ্যুতের জন্য এককালীন এবং প্রাথমিক যে খরচ প্রয়োজন সেটা নির্ভর করবে আপনি কোন উপায়ে সোলার সিস্টেম ব্যবহার করবেন। আপনি কি AC বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন নাকি DC বিদ্যুৎ!
ধরুন- আপনার দুটো DC ফ্যান – ২ (৩০x২ = ৬০ ওয়াট) , DC লাইট – ৫ (১০x৫ = ৫০ ওয়াট) জ্বলবে। সর্বমোট ওয়াট লাগবে- ১১০ ওয়াট। তাহলে আপনার সোলার প্যানেল লাগবে ১২০-১৫০ ওয়াটের। প্রতি ওয়াট সোলার প্যানেলের মূল্য (ভালো পণ্য অনুযায়ী) : ১৬৫ ওয়াট x ৫৫ = ৯০৭৫ টাকা। সোলার কন্ট্রোলার : ২০০০ টাকা। একটি ৬৫ অ্যাম্পেয়ার ব্যাটারি : ১০,০০০/- । এখানে সবগুলো ভালো প্রতিষ্ঠানের পণ্য হিসেব করা হয়েছে। ইন্সটেলেশান ও অন্যান্য সব মিলিয়ে আপনার প্রায় ২৫,০০০ টাকা লাগবে। ফ্যান ও লাইটের মূল্য আলাদা। যা পরবর্তীতে যুক্ত হবে।
DC সিস্টেম সেটআপ করার পর পরবর্তী সময়ে যতই ব্যবহার করবেন তার জন্য আলাদা সরকারি বিদ্যুৎ বিল গুনতে হবে না। এক কালীন খরচেই চলে যাবে।
AC সিস্টেম অনেকটা ব্যয়বহুল। তবে যা দীর্ঘ বছর ধরে ব্যবহার করতে চাইছেন তারা AC সিস্টেমকে পাশাপাশি রাখতে পারেন। এক সাথে ১ লাখ টাকা খরচ হলেও ১/২ বছরের মধ্যে সে খরচ মিটিয়ে ফেলা যাবে। কারণ একবার AC সেটআপ করা হয়ে গেলে পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় বাসা বা প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট পণ্যগুলো সোলার শক্তির মাধ্যমে চলার কারণে ওই যন্ত্রপাতির উপর আলাদা বিল আসবে না। সরাসরি সূর্য্যের আলোর মাধ্যমেই চলবে।
সোলার সিস্টেম ব্যবহার ব্যক্তিগত ব্যবহারের পাশাপাশি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চলুন সোলার সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সম্পর্কে জেনে নেই।
সূর্যের আলো শক্তির উৎস
সোলার প্যানেল সূর্য থেকে শক্তি গ্রহন করে বিদ্যুৎ প্রদান জীবাশ্ম জ্বালানীর বিপরীতে, যেমন কয়লা বা প্রাকৃতিক গ্যাস, সৌর শক্তি সময়ের সাথে সাথে ক্ষয় হয় না। এর মানে হল যে সৌর শক্তি বিদ্যুতের পাশাপাশি একটি শক্তি এবং টেকসই উৎস সরবরাহ করতে পারে, স্থায়ীভাবে সম্পদের ব্যবহারের উপর নির্ভরতা হ্রাস করে। সোলার প্যানেলগুলি ছাদ বা সূর্য্যের আলো পাওয়া যায় এমন সব জায়তায় ইনস্টল করা হয়। সৌর বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড (সরকারি বিদ্যুৎ) এর উপরন চাপ কমায়। এতে করে লোডশেডিং এর সম্ভাবনা।
লোড হ্রাস
সৌর শক্তি পিক লোডের চাহিদা কমাতে বিশেষভাবে কার্যকর। পিক লোড পিরিয়ডগুলো সাধারণত উচ্চ চাহিদার সাথে মিলে যায়, যেমন গরম গ্রীষ্মের বিকেলে যখন এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার বেশি হয়। সৌর প্যানেলগুলি এই সর্বোচ্চ সময়কালে সর্বাধিক বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে, গ্রিড থেকে বিদ্যুতের চাহিদা কমিয়ে দেয় এবং লোডশেডিংয়ের সম্ভাবনা হ্রাস করে।
গ্রিড স্বাধীনতা
সৌর শক্তি গ্রিড স্বাধীনতা একটি ডিগ্রী প্রদান করতে পারে. সৌর প্যানেল ইনস্টল করে এবং শক্তি সঞ্চয়ের ব্যবস্থা ব্যবহার করে, পরিবার, ব্যবসা এবং এমনকি সমগ্র সম্প্রদায়গুলি তাদের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সঞ্চয় করতে পারে। লোডশেডিংয়ের সময়, এই স্বয়ংসম্পূর্ণ সিস্টেমগুলি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা চালিয়ে যেতে পারে, প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলি নিশ্চিত করতে এবং বাধাগুলো কমিয়ে দিতে পারে।
পরিবেশগত সুবিধা
সৌর শক্তি হল একটি পরিষ্কার এবং টেকসই শক্তির উৎস যা অপারেশন চলাকালীন শূন্য গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন করে। জীবাশ্ম জ্বালানি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপর নির্ভরতা হ্রাস করে, সৌর শক্তি জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমিত করতে এবং বায়ুর গুণমান উন্নত করতে সহায়তা করে। সৌর শক্তিকে গ্রহণ করার মাধ্যমে, দেশগুলি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং আরও টেকসই ভবিষ্যতের প্রচারে বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টায় অবদান রাখতে পারে।
পরিশেষে লক্ষনীয় বিষয় এই যে, শুধুমাত্র সৌরশক্তি লোডশেডিং সম্পূর্ণরূপে দূর করতে পারে না, কারণ এটি বিভিন্ন কারণের উপর নির্ভর করে। যেমন সৌর ইন্সটলেশনের ক্ষমতা, সামগ্রিক বিদ্যুতের চাহিদা এবং গ্রিড অবকাঠামো। এনার্জি মিক্সে সৌরশক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা লোডশেডিংয়ের ঘটনা এবং সময়কালকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে, পাশাপাশি অনেক পরিবেশগত এবং শক্তি সুরক্ষা সুবিধাও প্রদান করে।
