প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে যেমন করেছে সহজ ঠিক তেমনি এই প্রযুক্তিরই রয়েছে অসম অপব্যবহার। প্রযুক্তি আমাদের জীবনে একটি অবিচ্ছেদ্য মৌলিক চাহিদা হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোন, কম্পিউটার এবং অন্যান্য অনলাইন ব্যবহার বিষয়ক ডিভাইসের সাথে আমাদের সন্তানদের জড়িয়ে পড়ছে। প্রযুক্তি মানুষের আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ, শেখা ও কাজের পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে যা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু মুদ্রার অপর পীঠ দিয়ে চিন্তা করলে এটি আমাদের বাচ্চাদের জীবনে বেশ কিছু ক্ষতিকারক প্রভাবও ফেলেছে। পজিটিভ বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। যেমন- বাচ্চারা আধুনিক শিক্ষা, উন্মুক্ত ইন্টারনেটের কারণে সারা বিশ্বের সংস্কৃতি, আচরণ, সভ্যতা ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করছে ঠিক তারই পাশাপাশি এর অনেকগুলো সেক্টর রয়েছে যা কি না আমাদের ভীষণ ভাবার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু আমাদের সন্তান, ওরা জন্মের পর থেকেই এ প্রযুক্তির বিষয়ে আসক্ত তাই এ্রর ক্ষতিকরণ প্রভাবগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অভিভাবক হিসেবে আমাদেরও ভেবে দেখতে হবে। প্রথম ব্লগ পোস্টে প্রযুক্তিতে শিশুদের বিচরণে ক্ষতিকর প্রভাব (পর্ব-১) নিয়ে আলোচনা করা হলো।

আমাদের এ সম্পাদকীয় ব্লগ পোস্টে আমরা আজকে প্রযুক্তিতে শিশুদের বিচরণে ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব। এরপরে সম্পাদকীয় আরেকটি পোস্ট প্রযুক্তিতে শিশুদের বিচরণে ক্ষতিকর প্রভাব থেকে উত্তরণ (পর্ব-২) নিয়ে আলোচনা করব। এতে সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের উপায় অর্থ্যাৎ কিভাবে প্রযুক্তির প্রভাব প্রযুক্তির মাধ্যমে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কোন সমস্যাকেই আমরা নির্মূল করতে পারব না। কিন্তু এটিকে আমরা একটা সহনীয় পর্যায়ে রাখার ব্যাপারে চেষ্টা করতে পারব।
বাঁধহীন জীবনযাত্রা
বাঁধহীন প্রযুক্তিময় জীবন যাপন- প্রযুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষতিগুলির মধ্যে একটি হল। আমাদের সন্তানরা লম্বা সময় ধরে স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা, ভিডিও খেলা, সোশ্যাল মিডিয়া অর্থ্যাৎ ফেসবুক, ইউটিউব ব্যবহার করার মাধ্যমে শারীরিক দুর্বল ভঙ্গিতা, দৃষ্টিশক্তিসহ নানান সমস্যা তৈরি হতে পারে। মানসিক ছাড়াও শারীরিকভাবে দুর্বল পেশী, হাড় সঠিক গঠন, শিশুদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যে প্রভাবিত করে থাকে।
অপর্যাপ্ত ঘুম তাই শারীরিক ও মানসিক সমস্যা
নীল রশ্নি ডিজিটাল ডিভাইস দ্বারা নির্গত হয়। নীল রশ্নি মেলাটোনিনের নিঃসরণকে প্রভাবিত করে। এই মেলাটোনিন আমাদের হরমোন যা ঘুমকে নিয়ন্ত্রণ করে। হার্ডওয়্যারগত ব্যবহার ঘুমের সময় ও জেগে ওঠার মধ্যে তারতম্য সৃষ্টি করে। যার ফলে ঘুমগত রোগ যেমন- অনিদ্রা, ঘুমে অনিয়ম এবং ক্লান্তি দেখা দেয়। ছোট বেলা থেকে এ অভ্যস্ততার কারণে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ব্যক্তিগত জীবনসহ একাডেমিক কর্মক্ষমতা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যে প্রভাবিত করে।
সামাজিক যোগাযোগে সমন্বয়হীনতা
সামাজিক যোগাযোগ মানুষ হিসেবে আমাদের সভ্য করে তোলে। এটি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বটে। মানুষ এক সাথে সময় কাটায় পরিবারের সাথে বা বন্ধু বান্ধবের সাথে। এছাড়াও ঘরের বাহিরে আমরা আলাদা করে একটা চক্র গড়ে তুলি যা কি না আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়ক বা পারিবারিক বিষয়ে আগ্রহ তৈরি করে তোলে। প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে আমরা প্রচুর সময় ব্যয় করি স্মার্ট ডিভাইসের সাথে। সামাজিকভাবে দূরে থাকার কারণে শিশুরা ব্যক্তি পর্যায়ে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে সভ্য আচরণ ও নৈতিকতা শিখনে অনভ্যস্ত হয়ে পড়ছে দিন দিন।
সাইবার বুলিং
প্রযুক্তির সব চেয়ে বাজে দিক হচ্ছে সাইবার বুলিং। অনলাইনে অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগ সাইট, চ্যাটিং প্ল্যাটফর্ম ইত্যাদির মাধ্যমে শিশুদের ভয়-ভীতি দেখানো, অপমানের স্বীকার হওয়া ইত্যাদি ঘটনা ঘটছে অহর। সাইবার বুলিং এর কারণে শিশুদের মাধ্যমে বাড়ছে বিষন্নতা ও একাকিত্বের মতো ভয়ংকর মানসিকতা। এই সাইবার বুলিং থেকে শিশুদের মধ্যে আত্মহত্যার মতো কারণও সামনে চলে আসে।
অস্বাভাবিক আচরণ
শিশুরা প্রযুক্তিতে আসক্ত হবেই। ভিডিও গেইম, ইউটিউব, চ্যাটিং প্ল্যাটফর্মসহ ইত্যাদি অনলাইন কার্যকলাপে তার মধ্যে অন্যতম। এইসব আসক্তি এক পর্যায়ে শিশুদের মধ্যে বিষন্নতা তৈরি করে, শারীরিকভাবে অস্বাভাবিক আচরণ তৈরি করে, পড়াশুনায় অনীহাসহ নানা ধরণের অসংলগ্ন আচরণ করতে থাকে। অবস্থান গিয়ে এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, বাচ্চাদের কাছে প্রশ্ন করেও সত্য ও স্বাভাবিক আচরণ পাওয়া যায় না। যা কি না সামাজিক অবক্ষয়ের প্রথম ধাপ।
তথ্যের অনাকাঙ্খিত অপব্যবহার
কয়েক কোটি ওয়েব সাইট আছে ইন্টারনেট জগতে। এছাড়াও এতে রয়ে ডার্ক সাইড। স্বাভাবিক পৃথিবীর মতো এতেও গড়ে উঠেছে প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবী। মানুষের মতোই ডিজিটাল আচরণ, যৌন বিষয়ক হেনস্থাসহ আরো অনেক নেতিবাচক দিকসমূহ। ইন্টারনেট ব্যবহারে দুর্ঘটনাচক্রে শিশুরা জড়িয়ে পড়তে পারে অনাকাঙ্খিত সামাজিক চক্রে। যা পরিবার ও সন্তানের মানসিক যন্ত্রণা ও আরো অনেক নেতিবাচক পরিণতির দিকে ধাবিত করবে।
অনলাইনে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিষয়ক ঝুঁকি
শিশুরা অবুঝ। কিন্তু অনলাইন জগতে সাইবার নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবিক জীবনে আপনি কোন একটি সমস্যায় পড়লে তাৎক্ষনিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী হতে সহায়তা প্রত্যাশা করতে পারেন। কিন্তু অনলাইনে সাইবার নিরাপত্তা এখনও বেশ দুরূহ। অনলাইন অটোমেশন হওয়ায় আপনার তথ্যগুলো হ্যাকার গ্রুপের তৈরিকৃত বিভিন্ন ভাইরাস বা ম্যালওয়্যার ব্যক্তি ছবি বা ভিডিও হাতিয়ে নিচ্ছে, তথ্য চুরি করছে, ব্যক্তিগত সময় বা তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রকাশ্যে। এই সমস্যাগুলো নিয়ে সাইবার নিরাপত্তা হিসেবে আমাদের ভাবতে হবে এখন থেকেই। একবার বেহাত হয়ে পড়লে সামাজিক, পারিবারিক তথ্য সামগ্রিকভাবে আমাদের হেয় হতে হয়।
আমাদের সময় এসেছে এ ব্যাপারগুলো নিয়ে আমাদের সন্তানদের সাথে আলোচনা করার। সন্তান অবুঝ হলে তাদের সাথে শারীরিক ব্যবহার বিষয়ক খেলাধূলার বিষয়ে আগ্রহ তৈরির চেষ্টা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবক হিসেবে প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিভাবে প্রযুক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো যায় এবং প্রতি আসক্তি কমানো যায়। শারীরিক কাজকর্মে উৎসাহ তৈরি করা, ঘরের বাহিরে খেলাধুলার আগ্রহ সৃষ্টি করা। আমাদের সন্তানদের শেখানো উচিত কিভাবে দায়িত্ব গ্রহন করতে হয়, দায়িত্ব পালন করতে হয় এবং নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে আলোচনা করা।
